পেঁয়াজ সংরক্ষণে ফরিদপুরে ব্যবহার বাড়ছে অনিয়ন ব্লোয়ার মেশিনের

দেশে পেঁয়াজের মোট চাহিদার বড় একটি অংশ আসে ফরিদপুর থেকে। চলতি বছর প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে হালি পেঁয়াজ আবাদ করা হয়, যা থেকে উৎপাদন হয়েছে ছয় লক্ষাধিক টন।

দেশে পেঁয়াজের মোট চাহিদার বড় একটি অংশ আসে ফরিদপুর থেকে। চলতি বছর প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে হালি পেঁয়াজ আবাদ করা হয়, যা থেকে উৎপাদন হয়েছে ছয় লক্ষাধিক টন। তবে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায় সংরক্ষণের অভাবে। এ সংকট নিরসনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) উদ্ভাবন করেছে এয়ার ফ্লো মেশিন। ২০২২ সালে কৃষক পর্যায়ে এ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। সহজেই স্থাপনযোগ্য এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে কৃষক পর্যায়ে।

কৃষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভালো ফল পাওয়ায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের নতুন দ্বার উন্মোচন হয়েছে। তারা মনে করেন, এ মেশিনের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশে পেঁয়াজের শতভাগ ঘাটতি মেটানো সম্ভব। এতে বাঁচবে বৈদেশিক মুদ্রা।

কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা থাকে ২৮ লাখ টন। অথচ উৎপাদন হয় ৩৬ লাখ টন। শুধু সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। প্রতি বছর প্রায় পাঁচ-ছয় লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয় সরকারকে। অনেক সময় কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন চাষীরা। এয়ার ফ্লো পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় অনেক বেশি পেঁয়াজ আট-নয় মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়, রঙও ভালো থাকে।

বোয়ালমারী উপজেলার চর মুরারদিয়া গ্রামের আব্দুল আজিজ ও মধুখালী উপজেলার জাহাপুরের নিখিল দাসসহ জেলার অন্যান্য কৃষক বলছেন, আকার ভেদে ব্লোয়ার মেশিনে ২০০-৩০০ মণ পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায়। এতে পেঁয়াজ নষ্ট হয় না, শুধু শুকিয়ে ৭-১০ শতাংশ কমে। প্রচলিত নিয়মে সংরক্ষণ করলে অন্তত ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে খরচও একদিকে কম হয়, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়। ভালো ফল পাওয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছেন তারা।

চাষীদের কাছে মেশিনটি সরবরাহ করছে নিউ শাপলা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী দুর্গা প্রসাদ সাহা জানান, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানসম্মত কাঁচামাল ও চীন থেকে মেশিন তৈরি করছেন তারা, যা বাজারে ১৮-২২ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ২০২২ সালে প্রথমে পাঁচটি মেশিন তৈরি করা হয়। পরে ২০২৩ সালে ১৫টি, ২০২৪ সালে ৯৭টি এবং ২০২৫ সালে সরাসরি কৃষকদের মাঝে ৬০০টি ও কৃষি অফিসের প্রণোদনা প্রোগ্রামের মাধ্যমে আরো ৩৫০টি মেশিন তৈরি ও সরবরাহ করা হয়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় মেশিনের গুণগত মান ঠিক রাখতে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিমিট) সিসা-ম্যাকানাইজেশন প্রোগ্রাম। তারা জেলার ১০টি কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এ শিল্প বিকাশে কাজ করছে।

কৃষি উন্নয়ন কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন জানান, পাউবো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মাধ্যমে পেঁয়াজ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনুধাবন করে, চাষীদের মূল সমস্যা সংরক্ষণ ব্যবস্থা। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সংস্থাটি এয়ার ফ্লো মেশিন উদ্ভাবন করে। ২০২২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র স্থানীয়ভাবে মেশিনটি তৈরি করে। প্রচলিত পদ্ধতিতে কৃষকের বসতঘরে টিনের চালের নিচে, বাঁশের মাচায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা হয় বিধায় উচ্চ তাপমাত্রা, অধিক আর্দ্রতা, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। এয়ার ফ্লো প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পেঁয়াজের সংগ্রহোত্তর ক্ষতি ১০-১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা যায়।

সিমিট-বাংলাদেশ, যশোর অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়ক মো. জাকারিয়া হাসান জানান, দেশজুড়ে এ মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি বছর ১০ লাখ টন পেঁয়াজ ব্যবহারযোগ্য থাকবে। এতে আমদানির ছয়-আট লাখ টনের ঘাটতি মিটিয়ে আরো অন্তত দুই-তিন টন উদ্বৃত্ত থাকবে।

আরও